বাংলাদেশের রাজনীতির এক আপসহীন ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায়, ফজরের নামাজের পর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সময় ও বিষয়টি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়,
“জাতীয় নেত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ ভোর ৬টায়, ফজরের নামাজের পর ইন্তেকাল করেছেন। আমরা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।”
অসুস্থতার মধ্যেও নির্বাচনী অঙ্গীকার
দীর্ঘদিনের গুরুতর অসুস্থতা, কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের পরও বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের প্রশ্নে ছিলেন অবিচল। চলতি বছরের নভেম্বর মাসে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনগণের ভোটে আবার রাজনীতির ময়দানে ফিরবেন তিনি।
এই নির্বাচনটি ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর প্রথম জাতীয় ভোট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ওই নির্বাচনে বিজয়ের অন্যতম দাবিদার ছিল এবং দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সামনে আনার প্রস্তুতি চলছিল।
এমনকি মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও তার পক্ষে তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

চিকিৎসা বঞ্চনা ও কারাবরণের দীর্ঘ ইতিহাস
গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের কারণে বেগম খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার মিথ্যা ও সাজানো মামলায় কারাবন্দি করে রাখে। সে সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেননি।
পরবর্তীতে করোনা মহামারির সময় তাকে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা হয় এবং সুচিকিৎসা গ্রহণে একের পর এক বাধা সৃষ্টি করা হয়। এতে তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে।
২০১৮ সালে মিথ্যে ও সাজানো দুর্নীতির মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি মুক্তি পান এবং ২০১৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সব মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে বাসায় ফেরেন। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে তিনি লন্ডনে গেলেও তখন তার শারীরিক অবস্থা এতটাই জটিল ছিল যে কোনো ধরনের বড় অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়নি বলে চিকিৎসকরা জানান।
দেশ-বিদেশে শোকের ছায়া
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শোকবার্তায় বলেন,
“বাংলাদেশ একজন অভিভাবককে হারাল।বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে জাতি তার এক মহান অভিভাবককে হারাল। তাঁর মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। বেগম খালেদা জিয়া শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রীই ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।”

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন পৃথক শোকবার্তায় বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।
ইতিহাসে চিরস্মরণীয়
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। মামলা, কারাবরণ, নিপীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মধ্যেও আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে তিনি ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ডিজিএন/এফএ

