আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) বর্তমানে বিবেচনা করছে, ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা করেছে কি না।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর গণহত্যার অভিযোগ এনে দায়ের করা আন্তর্জাতিক মামলাটি “ত্রুটিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন”।
বুধবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের সামরিক সরকার দ্য হেগে নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার দায়ের করা গণহত্যা মামলার তীব্র সমালোচনা করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, “গাম্বিয়ার আনা অভিযোগগুলো বাস্তবতা ও আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে ত্রুটিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “অবিশ্বস্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন কখনোই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না।”
২০২১ সালে ক্ষমতা দখল করা মিয়ানমারের সামরিক শাসকরা দাবি করেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তারা “সদিচ্ছার সঙ্গে” আইসিজে মামলায় সহযোগিতা করছেন।
২০১৯ সালে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করে। এর দুই বছর আগে, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়, যাদের বেশিরভাগই আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী বাংলাদেশে।
সামরিক অভিযানের প্রত্যক্ষদর্শীরা গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে কক্সবাজারের জরাজীর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সোমবার মামলার শুনানির প্রথম দিনে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাউদা জালো আদালতকে বলেন, রোহিঙ্গাদের “ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে”।
সামরিক শাসনাধীন মিয়ানমারের পক্ষে আইনজীবীরা শুক্রবার থেকে তাদের জবাব উপস্থাপন শুরু করবেন।
‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ অন্তর্ভুক্ত
এই মামলাটি গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে আইসিজেতে পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করা প্রথম গণহত্যা মামলা। এর রায় শুধু মিয়ানমার নয়, অন্যান্য আন্তর্জাতিক মামলাতেও প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলায়। শুনানি চলবে তিন সপ্তাহ ধরে।
২০১৭ সালের অভিযানের সময় জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান একে “জাতিগত নিধনের পাঠ্যবইয়ের উদাহরণ” বলে উল্লেখ করেছিলেন। জাতিসংঘের একটি তদন্ত মিশনও সিদ্ধান্ত দেয় যে, ওই সামরিক অভিযানে “গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড” অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে জানায়, এটি ছিল রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার জবাবে পরিচালিত একটি বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান।
বুধবারের বিবৃতিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করে তাদের “রাখাইন রাজ্যের ব্যক্তি” হিসেবে উল্লেখ করে।
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের কোনো স্বীকৃত জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকার করে না এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাসের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে।
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় দিতে মাস বা এমনকি বছরও লেগে যেতে পারে। যদিও আইসিজের নিজস্ব কোনো রায় বাস্তবায়নকারী ক্ষমতা নেই, তবে গাম্বিয়ার পক্ষে রায় গেলে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি বর্তমানে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করছে, যা জাতিসংঘ, পশ্চিমা দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অবাধ ও ন্যায়সঙ্গত নয়।
সূত্র : আল জাজিরা

