বছরের শুরুতে যখন নতুন বইয়ের ঘ্রাণে শিক্ষার্থীদের মন ভরে ওঠার কথা, তখন অভিভাবকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয় ‘ভর্তি ফি’ নামক এক প্রথা। বিশেষ করে বেসরকারি স্কুলগুলোতে প্রতি ক্লাসে নতুন করে পূর্ণ ভর্তি ফি আদায়ের বিষয়টি এখন রীতিমতো ‘অঘোষিত শিক্ষা শোষণে’ পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে একই স্কুলে এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে উত্তীর্ণ হলে কেন প্রতি বছর নতুন করে ভর্তি ফি দিতে হবে?
একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একবার ভর্তি হয়, তখন সে ওই প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ছাত্র বা ছাত্রী হিসেবে গণ্য হয়। সে বছর শেষে বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী ক্লাসে উন্নীত হয় মাত্র। এখানে নতুন করে ‘ভর্তি’ হওয়ার মতো কিছু ঘটে না। অথচ অধিকাংশ বেসরকারি স্কুল ‘সেশন চার্জ’ বা ‘পুনঃভর্তি’র নামে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। এটি কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। একজন শিক্ষার্থী তো আর নতুন করে স্কুল পরিবর্তন করছে না, তাহলে প্রতি বছর কেন তাকে ভর্তির ব্যয়ভার বহন করতে হবে?
বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবন যেখানে অতিষ্ঠ, সেখানে বছরের শুরুতে স্কুলগুলোর এই বাড়তি চাপ অভিভাবকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। বিশেষ করে যাদের একাধিক সন্তান একই স্কুলে পড়াশোনা করে, তাদের জন্য জানুয়ারি মাসটি এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভর্তি ফি, সেশন চার্জ, উন্নয়ন ফি এমন নানা অজুহাতে যে পরিমাণ টাকা নেওয়া হয়, তার ভার সইতে গিয়ে অনেক পরিবারকে ধার-দেনা করতে হচ্ছে।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, ভর্তি ফি বা সেশন ফি নির্ধারণের কিছু সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন রয়েছে। কিন্তু অনেক নামী-দামী স্কুল সেই নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো ফি নির্ধারণ করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, টিউশন ফি’র কয়েকগুণ বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে ভর্তি ফি হিসেবে। অথচ শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফাখোরি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো আচরণ করে, তখন জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগরদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এই অমানবিক প্রথা বন্ধ করতে হলে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
১. একই স্কুলে পুনঃভর্তির ক্ষেত্রে নামমাত্র সেশন ফি ছাড়া বড় অংকের ভর্তি ফি আদায় নিষিদ্ধ করতে হবে।
২. ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জেলা শিক্ষা অফিস বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের তদারকি জোরদার করতে হবে।
৩. যেসব প্রতিষ্ঠান নীতিমালা মানবে না, তাদের এমপিও বাতিল বা নিবন্ধন স্থগিতের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জনের পবিত্র স্থান, পকেট কাটার কারখানা নয়। একই স্কুলে প্রতি বছর পূর্ণ ভর্তি ফি আদায়ের এই অযৌক্তিক সংস্কৃতি বন্ধ করে শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, মানসম্মত শিক্ষা কেবল উচ্চবিত্তের বিলাসিতায় পরিণত হবে এবং সাধারণ মেধাবীরা ছিটকে পড়বে মূলধারা থেকে।
ওমর ফারুক
গণমাধ্যমকর্মী।

